বুড়ি ইজেরগিল

গল্পগুলো আমি শুনেছিল বেসারবিয়ার উপকূল অঞ্চলে, জায়গাটা আক্কেরমানের কাছে।

সন্ধ্যা হয়েছে। সারা দিনের আঙ্গুর তোলার কাজ শেষ করেছি আমরা; কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার কর্মসঙ্গী মল্দভীয় লোকগুলি সাগর বেলার দিকে চলে গের। বুড়ি ইজেরগিলের সঙ্গে আমির রয়ে গেলাম সেখানে। ঘন আঙ্গুর-ঝোপের ছায়ায় মাটিতে গা এলিয়ে দিলাম, চুপ করে দেখতে লাগলাম, সৈকতাভিমুখী কারো ছায়াগুলি ধীরে ধীরে রাত্রির অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

হাসি গানে মসগুল হয়ে তারা চলেছে বেলাভূমির দিকে। পুরুষগুলোর পরনে খাটো আলখাল্লা ও ঢিলে পাৎলুন, পোড়া তামাটে চেহারা, কালো মোটা গোঁফ আর মাথা ভরা কালো চুল কাঁধ পর্যন্ত পড়েছে। মেয়েরা চলেছে হাসিখুশি, লাবণ্যে ভরা দেহ, চোখ ঘন নীল, চেহারা তাদেরও পোড়া তামাটে। রেশমের মত কালো চুলগুলি এলিয়ে পড়ছে পিঠে। উষ্ণ হালকার হাওয়া দুলিয়ে দিচ্ছে ঘন কেশ, আর ঠুন ঠুন করে বেজে উঠছে কেশাভরণ টাকা-সিকির মালাগুলো। সমান ধারায় বাতাস বইছে অনেক জায়গা জুড়ে কিন্ত হঠাৎ যখন আসে দমকা হাওয়—যেন কোন অদৃশ্য ধাক্কা খেয়ে লাফিয়ে উঠেছে। মেয়েদের মাথার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে চুলগুলো, কেশরের মত অদ্ভুত রূপ নেয়। সে অবস্থায় তাদের দেখলে মনে হয় যেন কোন্ রূপকথার অদ্ভুত জগৎ থেকে বেরিয়ে এসেছে তারা। যত দূর তারা এগিয়ে যেতে থাকে, রাতের আঁধার আর আমার কল্পনা ততই তাদের সৌন্দর্যমন্ডিত করে তোলে।

কোথায় কে যেন একটা বেহালা বাজাচ্ছে...। একটি মেয়ে গভীর ভরাট গলায় গান ধরেছে। হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে...। সমুদ্রের উগ্র গন্ধ ও ভিজে মাঁটির সোঁদা গন্ধে বাতাস ভরপুর; সূর্যাস্তের কিছু পূর্বেই এক পশলা জোর বৃষ্টিতে মাটি ভিজে গেছে। এখনো আকাশের এখানে সেখানে বিচিত্র বর্ণের ও অদ্ভুত আকারের মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, কোথাও বা হালকা, যেন ধোঁয়ার কুন্ডলী, নীল বা বা ছাই রঙের, বা পিঙ্গল বর্ণের। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে নীল ফালিগুলো সানন্দে উঁকি মারছে, সোনালী তারায় খচিত সেই ফালিগুলি। এইসব—শব্দ ও গন্ধ, মেঘ ও মানুষগুলো—সব কিছুই কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে, সুন্দর অথচ বিষাদমাখা, যেন কোন বিস্ময়কর কাহিনীর উদ্ভোধন। সবকিছু দেখেই মনে হচ্ছে যেন তাদের বিকাশের বাধা পড়েছে, মনে যাচ্ছে যেন সব। মানুষগুলোর কন্ঠস্বর ক্রমে দূরে সরে যায়, তার পর মিলিয়ে যায়, বিষাদমাখা দীর্ঘনিশ্বাস হয়ে যায়।

‘তুমি ওদের সঙ্গে যাওনি কেন?’—যে দিকে ওরা চলে গেল সেই দিক পানে মাথা নেড়ে বুড়ি ইজেরগিল আমাকের জিজ্ঞাসা করে।

বয়সের ভারে বুড়ি বেঁকে তিনমাথার হয়ে গেছে। তার এককালের উজ্জ্বল কালো চুখদুটি আজ নিষ্প্রভ, অশ্রুময়, তার গলার শুকনো আওয়াজ কেমন অদ্ভুত শোনায়, কড়মড় করে ওঠে—যেন হাড় চিবোচ্ছে।

‘যাবার মন হল না’,—আমি বললাম।

‘এ্যাঁঃ... তোরা—রুশগুলো জন্মবুড়ো, সব আঁধার-মুখো, দানো যেন...। আমাদের মেয়েরা তোকে ডরায়...। কিন্তু তুই ত তাগড়া যোয়ান...।

আকাশে চাঁদ উঠে আসে, মস্তবড় গোল রক্তের মত লাল, মনে হয় যেন স্তেপের অন্তঃস্তল ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। এই স্তেপ কালে কালে কত নররক্ত, নরমাংস আত্মসাৎ করেছে, হয় ত তারি ফলে এর সমৃদ্ধি ও উর্বরতা। চাঁদের আলোয় আমাদের গায়ে আঙ্গুর-লতার ছায় পড়ে, বোনা-লেসের মত সে ছায়; আমি ও বুড়ি যেন জালে ঢাকা পড়ে গেছি। আমাদের বাঁ দিক দিয়ে চঞ্চল মেঘের ছায় ছুটে যায় স্তেপ পেরিয়ে। চাঁদের নীলাভ আলোয় মেঘগুলি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, অনেক হালকা ও স্বচ্ছ মনে হয়।

‘দ্যাখ্, দ্যাখ্! ওই দ্যাখ্ লারা!’

কম্পমান হাতের বাঁকা আঙ্গুলগুলি দিয়ে বুড়ি যেদিকে দেখিয়ে দেয় আমি সেদিকেই তাকাই, অনেকগুলি ভাসমান ছায়া চোখে পড়ে; কিন্তু অন্যগুলির চেয়ে একটা বেশি কালো ও ঘন মনে হয়। আর সবার চেয়ে জোরে ও নীচু দিয়ে ছুটেছে সেটা। যে মেঘটা ভাসছিল সব চেয়ে নীচে মাটির কাছে,

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice